চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে!

চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে!
 
চিত্র নায়ক সালমান শাহের বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবির ফেসবুকে এক ভিডিও ফুটেজ নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে।
 
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত রুবি তার ভিডিও ফুটেজে বলেন, ‘আত্মহত্যা নয়, হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হয়েছিলেন সালমান শাহ এবং তা করিয়েছিলেন তারই স্ত্রী সামিরা হকের পরিবার।'
 
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে হার্টথ্রব নায়ক সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটন রোডে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বাইশ বছর পর এই চিত্রনায়কের ‘বিউটিশিয়ান’ রুবির এই দাবিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন রহস্যঘেরা এই মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্বে থাকা পিবিআই’র (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ। সোমবার ফেসবুকে এই ভিডিওফুটেজ আপলোড হওয়ার পর তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজে যে মেয়েটি সালমান শাহকে হত্যা করার কথা বলেছেন, তিনি তার বিউটিশিয়ান ছিলেন। তিনি এই মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ২২ বছর পর হঠাৎ কেনইবা এ ধরণের স্বীকারোক্তি দেয়া হলো-তা আমরা তদন্ত করছি। তিনি জেনেশুনে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন-নাকি কেউ তাকে বলাতে বাধ্য করছে-সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই মামলায় মাত্র ৪ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সালমান শাহের ফ্ল্যাটের গৃহকর্মীদের কোন বক্তব্য নেয়া হয়নি। আমরা জানতে পেরেছি যে গৃহকর্মীরা বর্তমানে দেশের বাইরে চলে গেছেন। এ ছাড়া এই মামলায় সালমান শাহের স্ত্রী ও স্ত্রীর বাবাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। বর্তমানে সালশাহের স্ত্রী সামিরা থাইল্যান্ডে বসবাস করেন। সালমান শাহ যদি আত্মহত্যা করে থাকেন-সে ক্ষেত্রে কেনইবা তিনি এ কাজ করলেন এবং কারা থাকে বাধ্য করেছে-সেটিও মামলায় আগের তদন্তে স্পস্ট হয়ে ওঠেনি। তবে রুবির এই ভিডিও ফুটেজ আমরা আশা করছি যে এই মামলাটি তদন্তে নতুন করে গতি পাবে।’
 
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় থাকা রুবি সোমবার ফেসবুকে এক ভিডিওবার্তায় সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে বলেন, ‘সালমান শাহ আত্মহত্যা করে নাই। সালমান শাহকে খুন করা হইছে, আমার হাজব্যান্ড এটা করাইছে আমার ভাইরে দিয়ে। সামিরার ফ্যামিলি করাইছে আমার হাজব্যান্ডকে দিয়ে। আর সব ছিল চাইনিজ মানুষ।’
 
রুবি বলেন, ‘স্বামীর নাম চ্যাংলিং চ্যাং, যিনি বাংলাদেশে জন চ্যাং নামে পরিচিত ছিলেন। ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর সড়কে সাংহাই রেস্টুরেন্ট নামে তার একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁ ছিল।’
 
চিত্রনায়ক সালমান শাহ স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে যে এপার্টমেন্টে থাকতেন, সেখানেই একটি ফ্ল্যাটে রুবি থাকতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। লাশ উদ্ধারের সময় তার উপস্থিত থাকার তথ্যও রয়েছে।
 
রুবি দাবি করেন, ‘হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর তার ভাই রুমিকেও খুন করা হয়েছে। ইমনরে (সালমান শাহর প্রকৃত নাম) সামিরা, আমার হাজব্যান্ড ও সামিরার সমস্ত ফ্যামিলি সবাই মিলে খুন করছে। ইমনরে আমার ভাই রুমিরে দিয়ে খুন করানো হইছে। রুমিরেও খুন করানো হইছে। আমি জানি না, আমার ভাইয়ের কবর কোথায় আছে। রুমির লাশ যদি কবর থেকে তুলে পোস্টমর্টেম করে, তাহলে দেখা যাবে রুমিরে গলা টিপে মেরে ফেলা হইছে।’
 
ভিডিও ফুটেজে আরো বলা হয়, ‘আমি এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) ভেগে আসছি। আমাকে খুন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আপনারা আমার জন্য দোয়া করেন। আমি কী করব জানি না, এতটুকু জানি, সালমান শাহ (ইমন) আত্মহত্যা করে নাই।’
 
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় ভাড়া বাসায় পাওয়া যায় অভিনেতা সালমান শাহর লাশ। ওই ঘটনায় সালমানের বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। ২০০২ সালে মারা যান সালমান শাহর বাবা। লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে থাকা রুবির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছিলেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। পুত্রবধূ সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, চলচ্চিত্রের খল চরিত্রের অভিনেতা ও সালমানের বন্ধু আশরাফুল হক ওরফে ডন, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মাদ ভাই, রুবি, রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ, সহকারী নৃত্যপরিচালক নজরুল শেখ, ডেভিড, মোস্তাক ওয়াহিদ, আবুল হোসেন খান ও গৃহকর্মী মনোয়ারাকে ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে আদালতে আবেদন করেন নীলা চৌধুরী।
 
ঘটনাস্থলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এমন কয়েকজন যেমন, সালমানের বাসার গৃহকর্মী মনোয়ারা ও ডলি, সালমানের সহকারী আবুল হোসেন খান, সালমানের ফ্ল্যাটের নিরাপত্তারক্ষী আবদুল খালেক, ফ্ল্যাটের ব্যবস্থাপক নূরউদ্দিন জাহাঙ্গীর, লিফটম্যান আবদুস সালাম এবং সালমানের ফ্ল্যাটের আশপাশের বাসিন্দাদের কারও জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়নি।
 
সালমানের মা নীলা চৌধুরীর অভিযোগ, সেলিম নামে যে ব্যক্তি সালমানের মৃত্যুর খবর পরিবারকে জানাল, তারই জবানবন্দি নেয়া হয়নি কোনো তদন্তে। মরদেহ সিলিং ফ্যান থেকে নামানোর প্রত্যক্ষদর্শী কারও জবানবন্দি নেয়া হয়নি। আর ১৫ বছর ধরে চলা বিচার বিভাগীয় তদন্তে কেবল সালমান পরিবারের চার সদস্যের জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। ভালো করে তদন্ত না করেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সালমানের মৃত্যু আত্মহত্যাজনিত’। কিন্তু কী কারণে সালমান আত্মহত্যা করেন তার ব্যাখ্যা নেই কোনো তদন্ত প্রতিবেদনে।
 
সালমানের বাসা থেকে পুলিশ একটি সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার চিঠি উদ্ধার করে। চিঠিতে লেখা আছে, ‘আমি চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার, পিতা-কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, ১৪৬/৫, গ্রিনরোড, ঢাকা-১২১৫ ওরফে সালমান শাহ এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে আজ অথবা আজকের পরে যেকোনো দিন মৃত্যু হলে তার জন্য কেউ দায়ী থাকবে না। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে আমি আত্মহত্যা করছি।’ এই চিঠিতে কারও স্বাক্ষর ছিল না। তবে সিআইডির হস্তবিশারদেরা পরীক্ষা করে বলেছেন, এটা সালমান শাহের হাতের লেখা।
 
সালমানের মা নীলা চৌধুরী এই চিঠি নিয়ে গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ওকে ইমন নামেই ডাকতাম। অথচ চিঠিতে ইমন নামের কোনো অস্তিত্ব নেই। ও থাকে ইস্কাটনের বাসায়। কিন্তু ঠিকানা লেখা আছে আমাদের বাসার। সালমান শাহ নামটিও ঠিকানার পরে লেখা।’ চিঠির ভাষার আনুষ্ঠানিক ভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলে নীলা চৌধুরী আরও বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করার আগে এ রকম মামলা লেখার স্টাইলে এত গুছিয়ে বাবার নাম, ঠিকানা উল্লেখ করে চিঠি লেখে বলে আমার জানা নেই। এখানেই আমার ঘোরতর সন্দেহ।’
 
লাশ উদ্ধারের পর পরবর্তী সময়ে তদন্তকারী সংস্থা সালমানের ফ্ল্যাট থেকে দুটি ছোট বোতলে (ভায়েল) ভরা তরল পাওয়া যায়। সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষক মুহাম্মদ আবদুল বাকী মিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বর্ণহীন তরলে ‘লিগনোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড’ পাওয়া গেছে, চিকিৎসকেরা যেটি লোকাল অ্যানেসথেসিয়ার (স্থানীয় চেতনানাশক) কাজে ব্যবহার করেন।
 
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, একটি অপমৃত্যুর মামলা এতদিন ধরে তদন্ত করার নজির নেই। অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গেছে।’


EmoticonEmoticon